উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
বিশেষ প্রতিনিধি , Special Correspondent ||
একটা সময় সমাজে অবৈধভাবে টাকা উপার্জন করা মানুষের কোনো সামাজিক সম্মান তো ছিলই না, বরং সে অনেকটা সমাজচ্যুত হয়েই থাকত। কারও বাবা ঘুষখোর—এ কথা জানলে সেই পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা করতেও অনেকেই দ্বিধা করতেন। ছেলে প্রচুর টাকা আয় করলেও তার উপার্জনের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থাকলে অনেক পরিবার সেখানে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইত না। আর মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি তো সমাজে স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকার সুযোগই পেতেন না।কিন্তু সময় বদলেছে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি শুধু সময়ের সঙ্গে বদলেছি, নাকি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধও বদলে গেছে?আজ অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ অর্থের মালিকরাই হয়ে উঠছেন সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ। টাকা কোথা থেকে এসেছে—সেটা যেন আর খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়; কত টাকা আছে, সেটাই যেন ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি। অবৈধ অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করার বদলে অনেকেই সেই অর্থের মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চান, তার ক্ষমতার ছায়ায় থাকতে চান।এই বাস্তবতার মধ্যেই সম্প্রতি গাজীপুরের কাশিমপুর থানায় একটি ঘটনায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।ঘটনাটি একটি ১৬ বছরের মেয়েকে ঘিরে। মেয়েটি একটি ছেলের সঙ্গে চলে গেছে। মেয়েটির পরিবার উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিষয়টি নিয়ে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা, এমনকি বিএনপির নেতারাও থানায় কথা বলেছেন। ব্যক্তিগতভাবেও আমি প্রশাসনের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা পেয়ে থাকি। কিন্তু নিজে থানায় যাওয়ার পরও যখন দেখলাম মেয়েটিকে উদ্ধারের বিষয়ে কার্যকর কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না, তখন সত্যিই অবাক হয়েছি।পরে জানতে পারলাম, ছেলেটি এমন একটি পরিবারের সন্তান, যার বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে। তখন আমার মনে আরও একটি ভয়ংকর প্রশ্ন তৈরি হলো—একটি মাদক সিন্ডিকেটের প্রভাব কি এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে, একটি ১৬ বছরের মেয়েকে নিয়ে একজন ছেলে চলে যাওয়ার পরও তার পরিবারের অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়?অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।আইনের দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শিশু আইন, ২০১৩-এর ধারা ৪ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত একজন ব্যক্তি শিশু হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর বিভিন্ন বিধান অনুযায়ী বলপ্রয়োগ, প্রলোভন, ফুসলানো, ভুল বোঝানো বা ভয় দেখিয়ে কাউকে এক স্থান থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অপহরণের অভিযোগের আওতায় আসতে পারে। ঘটনার প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের ধারা ৭ প্রাসঙ্গিক হতে পারে।এ ছাড়া, কোনো নারীকে অপহরণ বা অ্যাবডাকশন করে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিতে বাধ্য করা কিংবা জোরপূর্বক বা প্রলোভনের মাধ্যমে অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়ানোর উদ্দেশ্য থাকলে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩৬৬ প্রাসঙ্গিক হতে পারে। আর ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো মেয়েকে প্ররোচিত করে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, যেখানে তাকে অন্য ব্যক্তির সঙ্গে জোরপূর্বক বা প্রলোভনের মাধ্যমে অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়ানোর উদ্দেশ্য বা সে বিষয়ে জ্ঞান থাকে, ধারা ৩৬৬A-ও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—একজন ১৬ বছরের মেয়ে কোনো ছেলের সঙ্গে চলে গেছে, শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে ৩৬৬ বা ৩৬৬A ধারার অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। কীভাবে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাকে প্ররোচিত বা ফুসলানো হয়েছিল কি না, বিয়ে বা যৌন শোষণের উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব বিষয় তদন্ত করার দায়িত্ব কার?রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থারই তো।ছেলেটি মেয়েটিকে নিয়ে চলে গেছে, মেয়েটির পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে এবং তারা থানায় প্রতিকার চাইছে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের অভিযোগ গ্রহণ, মেয়েটির অবস্থান শনাক্ত করা, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া কি অস্বাভাবিক কোনো দাবি?বরং এটিই তো স্বাভাবিক প্রত্যাশা।থানার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কথাবার্তা ও আচরণ নিয়েও আমার প্রশ্ন আছে। কিছু কথা প্রকাশ্যে বলার মতো নয়। তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে আমার মনে হয়েছে, কখনো কখনো পুলিশ জনগণের সেবক নয়; যেন জনগণকেই তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।এমন অভিজ্ঞতা একজন নাগরিককে শুধু হতাশ করে না, রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।অনেক ভেবেছি। শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানানোর সুযোগ পেয়েছি। এতে কাজ হবে কি না, জানি না। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও থানায় বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে পরিবারটির পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে। তারপরও গত ১০ দিনেও মেয়েটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি—এটাই সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।আমি যদি তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েও প্রশাসনের কাছে গিয়ে এমন অসহায়ত্ব অনুভব করি, তাহলে যাদের কোনো পরিচয় নেই, কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক যোগাযোগ নেই, তারা কী অবস্থার মধ্যে পড়ে—সেটা ভাবতেই ভয় লাগে।তাহলে একজন সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়?এই ঘটনার আরেকটি দিক আমাকে আরও বেশি ভাবাচ্ছে—মাদক সিন্ডিকেটের ক্ষমতা।এই ক্ষমতা তারা কোথা থেকে পায়?আমার কাছে এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো—অবৈধ অর্থের সামাজিক স্বীকৃতি।একসময় মানুষ অবৈধ টাকাকে ঘৃণা করত। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই টাকাই হয়ে উঠেছে সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতার উৎস। টাকার মালিক কে, তার গাড়ি কী, তার কত লোকজন, তার সঙ্গে কার যোগাযোগ—এসবই যেন গুরুত্বপূর্ণ। টাকার উৎস বৈধ কি না, সে প্রশ্নটি ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে।আর এখানেই মাদক সিন্ডিকেটের শক্তি।মাদক ব্যবসা শুধু মাদক বিক্রির ব্যবসা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বিপুল অবৈধ অর্থ, প্রভাব, ভয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতার ব্যবহার। ফলে একটি অপরাধী চক্র যখন সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে, তখন তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।আমরাও কি এর বাইরে?আমি নিজেকেও প্রশ্ন করি—আমি কতদিন পর্যন্ত লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব? কত টাকার প্রলোভন পর্যন্ত নিজেকে আটকে রাখতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তর আমারও জানা নেই।কারণ মানুষ হিসেবে আমাদের দুর্বলতা আছে। বৈধ অর্থ উপার্জনের পথ কঠিন হতে পারে, আর অবৈধ অর্থ অনেক সময় দ্রুত ক্ষমতা ও ভোগের সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু সেই অর্থের সামাজিক স্বীকৃতিই যখন বাড়তে থাকে, তখন অপরাধ শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে না; তা সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও দুর্বল করে দেয়।যেদিন সমাজ অবৈধ টাকার মালিককে সম্মান দেওয়া বন্ধ করবে, সেদিন থেকেই মাদক সিন্ডিকেট ও অপরাধী চক্রের সামাজিক শক্তি কমতে শুরু করবে।তাই মাদকবিরোধী লড়াই শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে শেষ হবে না। মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস বন্ধ করতে হবে, অপরাধীদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সাধারণ মানুষকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও আস্থা দিতে হবে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সাধারণ।আইনের শাসন কি সত্যিই সবার জন্য সমান হবে না?একজন সাধারণ মানুষ কি থানায় গিয়ে নিরাপদ প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রাখে না?একজন শিশুর পরিবার কি তার নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের কাছে নিশ্চিন্তে সাহায্য চাইতে পারবে না?আর কতদিন মাদক সিন্ডিকেটের ভয় ও প্রভাবের মধ্যে আমাদের সমাজকে থাকতে হবে?রাষ্ট্রের আইন যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে কোনো মাদক সিন্ডিকেটের কাছে একজন নাগরিকের অসহায় হওয়ার কথা নয়। আর যদি নাগরিক থানায় গিয়েও প্রতিকার পাওয়ার ব্যাপারে আস্থা হারায়, তাহলে সমস্যাটি শুধু একটি পরিবারের নয়—সমস্যাটি রাষ্ট্রের আইনশাসনের।আমরা যদি এখনই প্রশ্ন না তুলি, তাহলে একদিন হয়তো প্রশ্ন করার মতো নিরাপদ জায়গাটুকুও থাকবে না।আইনের শাসন কাগজে নয়, মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক—এটাই প্রত্যাশা।লেখকঃরুদ্র রহমান পিয়াল,আইন পরামর্শক, সাংবাদিক ও ছাত্রদল নেতা।