স্বর্ণ ও হীরা চোরাচালানের আড়ালে শত শত কোটি টাকা মানি লন্ডারিং, সাধারণ গ্রাহকদের সাথে জালিয়াতি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডসহ বহুবিধ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে আবারো গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর বনানী এলাকার একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং মামলার মূল তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ডিবির বিশেষ ব্রিফিং ও গ্রেপ্তার অভিযান
অভিযান শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বিশেষ ব্রিফিংয়ে জানান, দিলীপ কুমার আগরওয়ালা দীর্ঘ দিন যাবত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে বনানীর একটি গোপন আস্তানায় আত্মগোপনে ছিলেন। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার মামলার সুনির্দিষ্ট রিকুইজিশন ও অনুরোধের ভিত্তিতে ডিবির গুলশান বিভাগ এই অভিযান পরিচালনা করে। ডিবি প্রধান আরও স্পষ্ট করেন, দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে শুধু মানি লন্ডারিং নয়, এর আগে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য অভিযোগের নথিও নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
৬৭৮ কোটি টাকার মানি লন্ডারিং ও চোরাচালানের নথিপত্র
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, দিলীপ কুমার আগরওয়ালা ও তার প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড আইনি বৈধতা ছাড়াই বছরের পর বছর ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। সিআইডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল বা এলসি (ঋণপত্র) খোলার মাধ্যমে মাত্র ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার সোনা ও হীরা আমদানি করেছিল। অথচ একই সময়ে তাদের দেশের বিভিন্ন শোরুমে হাজার হাজার কোটি টাকার অলঙ্কার কেনাবেচা করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, স্থানীয় চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোনো কাস্টমস শুল্ক বা বৈধ উৎস ছাড়াই মোট ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকা মূল্যের স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই সুনির্দিষ্ট অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে, যার প্রেক্ষিতেই এবারের এই যৌথ অভিযান।
দৈনিক মুখপাত্র, রাজনৈতিক প্রভাব ও আওয়ামী দোসরদের সিন্ডিকেট
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দিলীপ আগরওয়ালা নিজের অপরাধের সাম্রাজ্যকে আড়াল করতে এবং সমাজে প্রভাবশালী হিসেবে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে 'দৈনিক মুখপাত্র' নামের একটি পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনা শুরু করেন। সাংবাদিকতার লেবাস ধারণ করে তিনি মূলত স্বর্ণ চোরাচালানের কোটি কোটি টাকার অবৈধ উৎস বৈধ করার চেষ্টা করতেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন।
দিলীপ আগরওয়ালা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই ব্যবসায়ী মূলত আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠ দোসর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি এবং বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও তাদের আত্মীয়দের সমন্বয়ে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই রাজনৈতিক দোসররা ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের শোরুম ও বিভিন্ন গোপন কার্যক্রমে অবৈধ অর্থ বিনিয়োগ করত এবং বিনিময়ে দিলীপ আগরওয়ালা তাদের অর্জিত বিপুল অঙ্কের কালো টাকা ও লুণ্ঠিত অর্থ চোরাচালান ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পাচার করে দিতেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও বাড্ডার হত্যা মামলা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দিলীপ আগরওয়ালার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়া সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ফ্যাসিবাদের দোসর এবং জুলাই বিপ্লব দমনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণের পেছনে অন্যতম অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে তার নাম জড়িয়ে পড়ে।
এর আগে, ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে গুলশানে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করে তৎকালীন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তাকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করে। এরপর কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকার বাড্ডায় কিশোর হৃদয় আহমেদ হত্যাকাণ্ডসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা মামলায় তাকে প্রধান আসামিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ মেয়াদে কারাভোগের পর দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে একে একে সবকটি হত্যা মামলায় জামিন লাভ করে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত হন। তবে কারামুক্ত হলেও তার বিরুদ্ধে থাকা অর্থনৈতিক অপরাধের তদন্তগুলো সচল ছিল।
গ্রাহক প্রতারণা ও দুদকের তদন্তের জাল
অর্থ পাচার ও হত্যা মামলার পাশাপাশি দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রাহকদের সাথে প্রতারণার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, যা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে তদন্তাধীন। ২০১৭ সাল থেকে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তারা আসল হীরার গহনা বিক্রির নামে সাধারণ গ্রাহকদের বোকা বানিয়ে অতি নিম্নমানের কাচ, কৃত্রিম জারকান পাথর এবং ল্যাবরেটরিতে তৈরি সস্তা মোজানাইট পাথর সরবরাহ করত। আসল হীরার সমমূল্য নিয়ে এই নকল গহনা বিক্রি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে তদন্তকারী দল।
এছাড়াও, রাজনৈতিক প্রভাব ও তৎকালীন প্রভাবশালী দোসরদের ক্ষমতার জোরে গত ১৫ বছরে দেশের ৩০টি শোরুমে ডায়মন্ড বিক্রির বিপরীতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার নথিপত্র এনবিআর এবং শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের হাতে এসেছে। বিগত সরকারের আমলে এনবিআরের ভ্যাট অডিট ও গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত শুরু করলেই প্রভাব খাটিয়ে কর্মকর্তাদের বদলি বা তদন্ত ফাইল ধামাচাপা দেওয়া হতো।
ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের মোড়কে সোনা চোরাচালানের সিন্ডিকেট, গ্রাহক ঠকানো নকল হীরার ব্যবসা এবং রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ার সমস্ত নথি সিআইডি ও দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এবারের গ্রেপ্তারের পর মানি লন্ডারিং মামলার রিমান্ড আবেদনের মাধ্যমে দিলীপ আগরওয়ালার এই বিশাল অপরাধ চক্রের নেপথ্যে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক রাঘববোয়াল ও দোসরদের নামও সম্পূর্ণভাবে উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ প্রশাসন।
গড় রেটিং: ৪/৫ (১ ভোট)
ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬
স্বর্ণ ও হীরা চোরাচালানের আড়ালে শত শত কোটি টাকা মানি লন্ডারিং, সাধারণ গ্রাহকদের সাথে জালিয়াতি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডসহ বহুবিধ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে আবারো গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর বনানী এলাকার একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং মামলার মূল তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ডিবির বিশেষ ব্রিফিং ও গ্রেপ্তার অভিযান
অভিযান শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বিশেষ ব্রিফিংয়ে জানান, দিলীপ কুমার আগরওয়ালা দীর্ঘ দিন যাবত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে বনানীর একটি গোপন আস্তানায় আত্মগোপনে ছিলেন। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার মামলার সুনির্দিষ্ট রিকুইজিশন ও অনুরোধের ভিত্তিতে ডিবির গুলশান বিভাগ এই অভিযান পরিচালনা করে। ডিবি প্রধান আরও স্পষ্ট করেন, দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে শুধু মানি লন্ডারিং নয়, এর আগে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য অভিযোগের নথিও নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
৬৭৮ কোটি টাকার মানি লন্ডারিং ও চোরাচালানের নথিপত্র
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, দিলীপ কুমার আগরওয়ালা ও তার প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড আইনি বৈধতা ছাড়াই বছরের পর বছর ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। সিআইডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল বা এলসি (ঋণপত্র) খোলার মাধ্যমে মাত্র ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার সোনা ও হীরা আমদানি করেছিল। অথচ একই সময়ে তাদের দেশের বিভিন্ন শোরুমে হাজার হাজার কোটি টাকার অলঙ্কার কেনাবেচা করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, স্থানীয় চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোনো কাস্টমস শুল্ক বা বৈধ উৎস ছাড়াই মোট ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকা মূল্যের স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই সুনির্দিষ্ট অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে, যার প্রেক্ষিতেই এবারের এই যৌথ অভিযান।
দৈনিক মুখপাত্র, রাজনৈতিক প্রভাব ও আওয়ামী দোসরদের সিন্ডিকেট
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দিলীপ আগরওয়ালা নিজের অপরাধের সাম্রাজ্যকে আড়াল করতে এবং সমাজে প্রভাবশালী হিসেবে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে 'দৈনিক মুখপাত্র' নামের একটি পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনা শুরু করেন। সাংবাদিকতার লেবাস ধারণ করে তিনি মূলত স্বর্ণ চোরাচালানের কোটি কোটি টাকার অবৈধ উৎস বৈধ করার চেষ্টা করতেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন।
দিলীপ আগরওয়ালা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই ব্যবসায়ী মূলত আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠ দোসর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি এবং বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও তাদের আত্মীয়দের সমন্বয়ে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই রাজনৈতিক দোসররা ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের শোরুম ও বিভিন্ন গোপন কার্যক্রমে অবৈধ অর্থ বিনিয়োগ করত এবং বিনিময়ে দিলীপ আগরওয়ালা তাদের অর্জিত বিপুল অঙ্কের কালো টাকা ও লুণ্ঠিত অর্থ চোরাচালান ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পাচার করে দিতেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও বাড্ডার হত্যা মামলা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দিলীপ আগরওয়ালার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়া সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ফ্যাসিবাদের দোসর এবং জুলাই বিপ্লব দমনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণের পেছনে অন্যতম অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে তার নাম জড়িয়ে পড়ে।
এর আগে, ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে গুলশানে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করে তৎকালীন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তাকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করে। এরপর কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকার বাড্ডায় কিশোর হৃদয় আহমেদ হত্যাকাণ্ডসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা মামলায় তাকে প্রধান আসামিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ মেয়াদে কারাভোগের পর দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে একে একে সবকটি হত্যা মামলায় জামিন লাভ করে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত হন। তবে কারামুক্ত হলেও তার বিরুদ্ধে থাকা অর্থনৈতিক অপরাধের তদন্তগুলো সচল ছিল।
গ্রাহক প্রতারণা ও দুদকের তদন্তের জাল
অর্থ পাচার ও হত্যা মামলার পাশাপাশি দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রাহকদের সাথে প্রতারণার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, যা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে তদন্তাধীন। ২০১৭ সাল থেকে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তারা আসল হীরার গহনা বিক্রির নামে সাধারণ গ্রাহকদের বোকা বানিয়ে অতি নিম্নমানের কাচ, কৃত্রিম জারকান পাথর এবং ল্যাবরেটরিতে তৈরি সস্তা মোজানাইট পাথর সরবরাহ করত। আসল হীরার সমমূল্য নিয়ে এই নকল গহনা বিক্রি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে তদন্তকারী দল।
এছাড়াও, রাজনৈতিক প্রভাব ও তৎকালীন প্রভাবশালী দোসরদের ক্ষমতার জোরে গত ১৫ বছরে দেশের ৩০টি শোরুমে ডায়মন্ড বিক্রির বিপরীতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার নথিপত্র এনবিআর এবং শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের হাতে এসেছে। বিগত সরকারের আমলে এনবিআরের ভ্যাট অডিট ও গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত শুরু করলেই প্রভাব খাটিয়ে কর্মকর্তাদের বদলি বা তদন্ত ফাইল ধামাচাপা দেওয়া হতো।
ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের মোড়কে সোনা চোরাচালানের সিন্ডিকেট, গ্রাহক ঠকানো নকল হীরার ব্যবসা এবং রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ার সমস্ত নথি সিআইডি ও দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এবারের গ্রেপ্তারের পর মানি লন্ডারিং মামলার রিমান্ড আবেদনের মাধ্যমে দিলীপ আগরওয়ালার এই বিশাল অপরাধ চক্রের নেপথ্যে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক রাঘববোয়াল ও দোসরদের নামও সম্পূর্ণভাবে উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ প্রশাসন।